মঙ্গলবার, ২৫ Jun ২০১৯, ০১:৫৬ অপরাহ্ণ

মৃণাল সেনের সৃষ্টি পৌরসভার জঞ্জাল ফেলার গাড়িতে!

মৃণাল সেনের সৃষ্টি পৌরসভার জঞ্জাল ফেলার গাড়িতে!

বরাবরই একটু ভিন্ন প্রকৃতির মানুষ ছিলেন বিশ্ববরেণ্য চিত্রপরিচালক মৃণাল সেন। থাকতেন অনেকটা অগোছালোভাবে। যখন ইচ্ছে হতো, তখনই বসে পড়তেন লিখতে। কোনো কিছুই তেমন গোছগাছ করে রাখতেন না। এরই মধ্যে কোন খেয়ালে তিনি পৌরসভার জঞ্জাল ফেলার গাড়ি ডেকে তুলে দিয়েছিলেন তাঁর সৃষ্টিকে। তার মধ্যে ছিল বিভিন্ন ছবির পাণ্ডুলিপি, মেডেল, পদক আর পুরস্কার।

গতকাল রোববার মৃণাল সেনের পুরোনো বাড়িতে বসে সাংবাদিকদের বললেন মৃণাল সেনের একমাত্র ছেলে কুণাল সেন। বললেন, ‘রাতভোর’ থেকে ‘আমার ভুবন’ পর্যন্ত ২৭টি ছবি বানিয়েছেন মৃণাল সেন। আরও ছিল চারটি পূর্ণদৈর্ঘ্য তথ্যচিত্র। পেয়েছিলেন নানা পদক আর পুরস্কার। সেই ১৯৫৬ থেকে ২০০২ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ এই ৫৬ বছরে তিনি দেশ-বিদেশের বহু চলচ্চিত্রকার, সমালোচক আর তাঁর বন্ধুদের কাছ থেকে পেয়েছিলেন নানা চিঠি। এই সবই তিনি সেদিন তুলে দিয়েছিলেন পৌরসভার জঞ্জাল ফেলার গাড়িতে।

কুণাল সেন বলেন, ‘হারিয়ে গেছে বাবার “পদাতিক”, “খারিজ”, “কলকাতা ৭১” ছবির পাণ্ডুলিপি। শুধু পাণ্ডুলিপি নয়, বেলতলা রোডে আমাদের এই ছোট্ট বাড়িতে একসময় ছিল প্রচুর বইয়ের সমারোহ। সেই সব বইয়ের অধিকাংশের এখন খোঁজ মিলছে না। খোঁজ মিলছে না বহু পদক আর পুরস্কারের। অধিকাংশ পাণ্ডুলিপি, পদক ও পুরস্কার বাবা একদিন পৌরসভার জঞ্জাল ফেলার গাড়িতে তুলে দিয়েছিলেন। বাবা কোনো দিন গোছালো ছিলেন না। যখন প্রয়োজন হতো, তখনই লিখতেন। ছবির প্রয়োজনে একটা শট বারবার নিলেও অধিকাংশ সময়ে তিনি চিত্রনাট্য লিখতেন একবারই। সেই চিত্রনাট্য নিয়ে ছবি বানাতেন। আর ছবি তৈরি হয়ে গেলে সেই চিত্রনাট্য আর গুছিয়ে রাখতেন না।’

কুণাল সেন আরও বলেন, ‘২০০৩ সালের গোড়ার দিকে বেলতলার বাড়ি বদলের সময় হঠাৎ বাবা সব কাগজ গোছাতে শুরু করেন। মাকে নিয়ে গোছগাছ শুরু করেন। বেশ কদিন গোছগাছও করেন। হঠাৎ একসময় বাবার মনে হলো, এসব রেখে আর কী হবে? তারপর পৌরসভার গাড়ি ডেকে তুলে দেন ওই সব কাগজ। ওই সময় গাড়ির চালক জঞ্জালে ফেলা তাঁর একটি ব্যাগ থেকে শুনতে পান ঝনঝনানির শব্দ। খুলে দেখেন তাতে কিছু মেডেল আর পুরস্কার। তখন বাবা গাড়ির চালককে বলেন, রেখে কী হবে? ফেলে দেন।’

কুণাল সেন এখন আছেন কানাডায়। সেখানে স্থায়ীভাবে আছেন। ৩২ বছরের বেশি সময় তিনি বাইরেই আছেন। বললেন, ‘বাবা-মায়ের জন্য বারবার ছুটে এসেছি কলকাতায়। মা মারা গেছেন ২০১৭ সালে। আর বাবা গেলেন গত ৩০ ডিসেম্বর সকালে। বাবা-মায়ের জন্য বারবার আমাকে টেনে এনেছে এই কলকাতায়। বাবা চলে গেলেন। আমার যোগাযোগের মূল সুতো ছিঁড়ে গেল। এবার চলে গেলে মন ভরে জেগে থাকবে শুধু কলকাতা আর বাবা-মায়ের স্মৃতি।’

জানালেন, এখনো তাঁদের বাড়িতে হাজারখানেক বই রয়েছে। এই বইগুলো এবার জাতীয় স্তরের কোনো সংগঠনের হাতে তুলে দেবেন। যদিও অনেক নামীদামি বইয়ের এখন আর খোঁজ মিলছে না।

গত ৩০ ডিসেম্বর সকালে বার্ধক্যজনিত রোগে ভুগে কলকাতার ভবানীপুরের নিজ বাসভবনে প্রয়াত হন মৃণাল সেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৯৫ বছর। বাংলাদেশের ফরিদপুর শহরে ১৯২৩ সালের ১৪ মে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তাঁর শৈশব ও কৈশোর কেটেছে ফরিদপুর শহরে। ১৯৪৩ সালে ফরিদপুরের রাজেন্দ্র কলেজে পড়ার সময় তিনি চলে আসেন কলকাতায়। তারপর এখানে স্কটিশ চার্চ কলেজে স্নাতক পর্যায়ে ভর্তি হন।

মৃণাল সেন ১৮টি ছবির জন্য পেয়েছিলেন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার। পেয়েছিলেন ১২টি আন্তর্জাতিক পুরস্কার। বাংলা, হিন্দি, ওড়িয়া ও তেলেগু ভাষায় ছবি নির্মাণ করেছেন। তাঁর প্রথম ছবি ‘রাতভোর’ নির্মিত হয় ১৯৫৫ সালে। এরপরের ছবি ছিল ‘নীল আকাশের নিচে’। পেয়েছেন ভারতের বিনোদন জগতের সর্বোচ্চ সম্মান দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কার (২০০৫)সহ ভারতের রাষ্ট্রীয় সম্মান পদ্মশ্রী (১৯৮১। পেয়েছেন ফরাসি সরকারের দেওয়া ‘কমান্ডার অব দ্য অর্ডার অব আর্টস লেটারস সম্মান’।





© Agooan News 2017
Design & Developed BY ThemesBazar.Com