রবিবার, ১৮ অগাস্ট ২০১৯, ০৯:১৪ অপরাহ্ণ

সর্বশেষ সংবাদ :
চট্টগ্রাম জামেয়া ময়দানে লাখো মুসল্লীদের উপস্থিতিতে আল্লামা তৈয়্যেব শাহ্ (রহ.) এর পবিত্র ওরশ মোবারক উৎযাপিত ঢাকায় সৈয়দ তৈয়্যেব শাহ্ (রহ.) এর পবিত্র ওরশ মোবারক অনুষ্ঠিত মাহবুবা স্মৃতির গল্প: দীর্ঘছায়া স্বীকৃতি পেতে শেষ পর্যন্ত ঘুষের আশ্রয় নিচ্ছে ইসরাইল: কিন্তু কেন এ ব্যর্থতা? সাঁওতালপল্লিতে হত্যা-অগ্নিসংযোগে ৯০ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দিল পিবিআই জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলা: খালোদা জিয়ার জামিন আবেদনের শুনানি মঙ্গলবার বিএনপি নেতাদের মুখে বিচারহীনতার কথা শোভা পায় না: ওবায়দুল কাদের ভাটপাড়ায় বহিরাগত দুর্বৃত্তরা অশান্তি করছে, পুলিশ ব্যবস্থা নিক: ফিরহাদ হাকিম ইয়েমেন থেকে বহু সেনা প্রত্যাহার করেছে আরব আমিরাত ইসরাইলের কাছে বায়তুল মুকাদ্দাসকে বেচতে দেব না: মাহমুদ আব্বাস
মাহবুবা স্মৃতির গল্প: দীর্ঘছায়া

মাহবুবা স্মৃতির গল্প: দীর্ঘছায়া

দীর্ঘছায়া

মাহবুবা স্মৃতি

 

 

রমজান আলী সেই সকাল থেকে দুইটা হাঁস নিয়ে বাজারে বসে আছেন। হাঁস দুইটা তাঁর মেয়ে শিখার খুবই পছন্দের। হাঁস নিয়ে আসার সময় মেয়ে মন খারাপ করে দাঁড়িয়ে ছিল ছোট ভাই রাতুলের হাত ধরে।নিরুপায় রমজান দুই ভাই-বোনের পরীক্ষার ফি যোগার করতে পারেনি বলেই আজ হাঁসদুটো বাজারে নিয়ে এসেছে বিক্রি করার জন্য।তবে আসার সময় মেয়েকে কথা দিয়েছে,ক্ষেতের ধান বিক্রি করে মেয়েকে পরে আবার এরকম দেখেই দুটো হাঁস কিনে দিবেন আবার।এবার ফলন বেশ ভালো হয়েছে রমজানের।খাটুনি আর খরচ দুটোই সার্থক বলা যায়।ভালো দামে বিক্রি করতে পারলেই হলো।তাই রমজানের এখন কেবল বিক্রির জন্য অপেক্ষা।বেশিদিন সময় লাগার কথা নয়,ধান প্রায় পেকে সোনালি বর্ণে পরিণত হয়েছে।

কিন্তু এদিকে সূর্যটা মাথার উপর উঠে গেল,রমজানের হাঁস বিক্রি করা হচ্ছেনা কোনো ভাবেই। যা দাম বলছে ক্রেতারা,তা দিয়ে দেয়ার মতো না।দুটো হাঁস মাত্র ৩০০টাকা দিতে বলে।একজন তো আড়াইশো বললো!

‘মাইনষের আন্দাজগুলা দিনদিন কইম্যা যাইতাছে,কি কও মুন্সী ভাই??”

-“হ, তা তুমি ঠিক কইছো। আমিও দেহোনা কয়েকটা ধুন্দুল নিয়া বইসা আছি।পাঁচ টেহা কেজি কয়..!”কলিমুদ্দিন মুন্সী জবাব দেয়।কথা শুনে রমজান আলী একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে।অন্যের কাছে কি আর মনের দুঃখ বলবে সে,মানুষেরই তো দুঃখের শেষ নাই।কাঁধে রাখা গামছাটা দিয়ে ঘর্মাক্ত মুখটা মুছে নেয়।

“চাচা, হাঁস দুইটা কতো?”চেয়ারম্যান এর ছেলে ফয়সালের ডাক শুনে উপরের দিকে তাকায়।রমজানের চোখ চকচক করে উঠে।সাক্ষাত লক্ষ্মীর আগমন।তাই তাড়াতাড়ি বলে উঠে,”বাবা তোমার কাছে কি বেশি চামু?বেলাও হইছে অনেক।৫০০টাকার নিচে বিক্রি করতামনা,কিন্তু তুমি যহন চাইছো ৪০০ টেকা দাও,দিয়া দেই।”

-“কি কন চাচা! এতো কেমনে হয়!হাঁসের দাম এতো চাইলে কিনমু কেমনে!”

-“কি যে কও তুমি! পরীক্ষার ফি দেয়া লাগবো মাইয়া আর পোলার।কিছু টাকা টান পড়ছে,হের লাইগা ডিম পাড়নের হাঁসই বিক্রি করতে আনছি।ধইরা দেহো

হাঁসদুটার ওজন,ভাত খাওয়াইয়া পালছে আমার মাইয়ায়।”

-“না না চাচা,এতো দামে হাঁস নিবার পারুম না।তুমি আরো দাম কমাও।”

-“এতো কইরা যহন কইতাছো,৫০টেহা কম দাও।তোমাগোর তো আর টেহাপয়সার অভাব নাই।”

শেষপর্যন্ত তিনশো টাকা হাতে ধরিয়ে দেয় চেয়ারম্যানের ছেলে।রমজান তাকিয়ে থাকে ফ্যালফ্যাল করে।”এইডা তুমি ঠিক করলা বাবা!দুইটা হাঁস কেমনে ৩০০টেকা হয়!”

-“চাচা যা দিছি,শোকরিয়া জানান।”এটা বলে ফয়সাল চলে যায়।রমজানের মাথায় বাজ পড়ে।কি করবে সে ভেবে পায়না।কিছু টাকা ধার করে সন্ধ্যায় সে বাড়ি ফিরে।কথা দিয়ে আসে, ধান বিক্রি করেই ৫০০টাকা দিয়ে দিবে।

ধান কাটার সময় আসে।রমজানের আনন্দ আর ধরেনা।ক্ষেতে ধান দেখে তাঁর মন জুড়িয়ে যায়।কিন্তু ধান কাটার লোক আনতে গিয়ে পড়লো বিপত্তিতে!

“৮০০টাকা রোজ!কেমনে কি!”ওদিকে লোক মুখে শুনেছে রমজান,ধান নাকি এবার ৫০০টাকা মণের বেশি বিক্রি করা যাবেনা।যে স্বপ্ন রমজান দেখেছিল,তা এক নিমিষেই নিভে গেল।কি করবে!রাগে মাথার চুল টেনে ধরে রমজান।একবার ভাবে, ধান ক্ষেতে আগুন লাগিয়ে দিবে।কিন্তু রাগটাকে সামাল দেয় সে কোনোমতে।তার এতোদিনের কষ্টের ফসলে কিভাবে আগুন লাগায় সে?একজন লোক নিয়ে সারাদিন রোদে পুড়ে ধান কাটে সে।পরেরদিন একা একাই ধান কাটে, তাতে হাত লাগায় রমজানের বউ আয়শাও।মাঝরাত অবদি তাঁদের ধান কাটা চলে।একটা সময় শেষ হয়।ধান গুলো আলাদা করা হয়।

রমজান যখন ভ্যান গাড়িতে ধানের বস্তাগুলো উঠাতে ব্যস্ত,তখন মেয়ে শিখা এসে বলে,”আব্বা..তুমি কিন্তু কইছো দুইটা হাঁস আমারে আবার কিন্যা দিবা।”মেয়ের কথায় সাঁয় দেয় সে।রাতুল এসে বলে,”আমার লাগি একটা ফুটবল কিন্যা আনবা ।”চাপা একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে আল্লাহর নাম নিয়ে রমজান বেড়িয়ে পড়ে। পনেরমন ধান সে মাত্র সাড়ে সাত হাজার টাকায় বিক্রি করে। টাকা গুলো হাতে নিয়ে ধপাস করে বসে পড়ে সে।ধানের পিছনে তার কমপক্ষে ১০হাজার টাকা খরচ হয়েছে,সেখানে ধান বিক্রি করেছে মাত্র সাড়ে ৭হাজার টাকা!ধারও করেছে অনেক।এসব দিবে কি করে সে!ছেলেমেয়ের আবদারই বা কিভাবে মেটাবে।হাঁস কিনতে গিয়ে দেখে দুইটা হাঁস ৭০০টাকা চাচ্ছে।দেখতেও ততো ভালোনা হাঁসদুটো। আর রমজানের মতো মানুষ হাঁস বিক্রি করে ১৫০টাকা দরে!

‘গরিবের দিকে খোদা যেখানে তাকায়না,সেখানে মানুষ কেন তাকাতে যাবে!’ তবু্ও রমজান এতো দাম দিয়েই হাঁস কিনে,ছেলের জন্য কিনে ফুটবল ।সাথে আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ জিনিস সে কিনে পাঞ্জাবীর পকেটে করে বাড়িতে নিয়ে আসে।আসার পরপরই ছেলেমেয়ে রমজানকে ঘিরে ধরে।যার যার জিনিস পেয়ে ওরা খুব খুশি।

রাতে রমজান খেতে বসে।ছেলেমেয়েরা খেয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে।অন্যসময় রমজান খেতে বসে সংসারের টুকটাক পরিকল্পনার কথা আয়শার সঙ্গে বলে থাকে।কিন্তু রমজান আলী আজ নিরুক্ত।তবে তাঁর চোখদুটো আগুনের মতোই জ্বলছে। সেখানে অনেক রাগ আর ক্ষোভ।কষ্টটা সে আগুনে ঢাকা পড়েছে।আয়শা সেদিকে তাকিয়ে ভয় পায়।ভয়ার্ত গলায় কোনোমতে বলে,”কি হইছে আপনার?আপনারে এমুন লাগতাছে ক্যান?ঠিকমতন ভাতও খাইতাছেননা!”

-“কিছু হয় নাই।” কথাটা বলেই রমজান প্লেটের ভাতটুকু দ্রুত খেয়ে শেষ করে।তারপর কোনোমতে বসা থেকে উঠে দাঁড়ায়।ঘরের দাওয়ায় গিয়ে আবার বসে পড়ে।আয়শা দাওয়ায় এসে স্বামীর পাশে বসে।

বাইরে ঘুটঘুটে অন্ধকার।আঁধারের ভেতরেও আজ দ্বিগুণ আঁধার নেমে এসেছে।যা ভেদ করা খুব কঠিন।বিদ্যুৎ ও নেই আজ।আকাশটাও কেমন থমকে আছে।মনে হয় ভেঙ্গে পড়বে। দুএকটা প্যাঁচা ডেকে যাচ্ছে।প্যাঁচার ডাক আয়শার সহ্য হয়না।সবসময় তাঁর মনে হয় প্যাঁচার ডাক একধরনের বিপদ ডেকে আনে বাড়িতে।ধড়ফড় করতে থাকে বুক।মনে মনে প্যাঁচাকে গালি দিতে থাকে..তারপর রমজান আলীর দিকে তাকায় সে।

“ও..শিখার বাপ,কি হইছে আপনের?এমুন কইরা দাওয়ায় বইসা আছেন ক্যান?ঘুমাইবেননা? ”

রমজান বউয়ের দিকে তাকায়। অন্ধকারে ভালো বোঝা যায়না।তবু্ও বুঝতে পারে সে,বউ তার আগ্রহ নিয়ে চেয়ে আছে।মুখে দুশ্চিন্তার ছাপ।আয়শার অস্পষ্ট মুখের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে রমজান।তারপর বলে,”বউ তোমারে সারাজীবন খুব কষ্ট দিছি,তাইনা?”

-“ওমা!কি কন এসব!কষ্ট দিলেন কই?”

-” হ,দিছিগো বউ…আইচ্ছা,তোমার লাগি আইজ যে শাড়িডা কিন্যা আনছি,এইডা এট্টু পড়ো তো দেহি..”

আয়শা লজ্জায় মরে যায়।”ওহন বুঝি শাড়ি পড়মু!”

-” হ পড়ো,দেখবার মন চাইতাছে।”

আয়শা শাড়ি পড়তে ঘরে চলে যায়।রমজান ছোট্ট করে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। আয়শা শাড়ি পড়ে গুটিগুটি পায়ে এগিয়ে এসে রমজানের পাশে বসে।রমজান বুঝতে পারছে,আয়শা খুব লজ্জা পাচ্ছে।বিয়ের রাতের কথা মনে পড়ে রমজানের।বিয়ের রাতেও আয়শা এভাবেই লজ্জায় মরে যাচ্ছিল।অভাবের সংসারে আয়শা ঘর আলো করেই এসেছিল।তারপর শিখা আর রাতুলের আগমন পরিবারে।স্বপ্ন ছেলেমেয়েদের পড়াশোনা করাবে।কিন্তু সবকিছু আজ অনিশ্চিত! লাভের জায়গায় ক্ষতির পরিমাণটাই যেখানে বেশি,সেখানে বেঁচে থাকার মোহটা অনেক বেশি তিক্ত!কেউ কি বুঝবে ওঁদের কষ্ট?

রমজান আয়শার হাতটা ধরে।আয়শা লজ্জা পায়।বলে,”ছেলেমেয়ে উইঠ্যা যাইবো যেকোনো সময়।”তবু্ও রমজান আয়শার হাত ধরে থাকে.. কতোক্ষণ জানেনা সে,মনে হয় অনাদিকাল থেকেই ধরে আছে হাতটা সে।ভিতরটা তার ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠছে।জীবনের কাছে আজ সে পরাজিত।আয়শাকে ধরে খুব কাঁদতে ইচ্ছে করছে রমজানের।পুরুষদের কান্না মানায়না।আর বউকে ধরে ভদ্র সমাজে কিছুটা কান্না করা গেলেও এ সমাজের বেলায় তা মোটেও খাটেনা।আলগা হয়ে আসে রমজানের হাতটা।তারপর কি ভেবে বলে,”তুমি ছেলেমেয়েদের দেইখো,আমি আইতাছি।”

আয়শা বেদনাহত হয়ে বলে,”কই যান এতো রাইতে?”

রমজান দাঁড়ায়না।আয়শা আবারো কিছু বলতে যায়,কিন্তু রমজান ততোক্ষণে বাড়ির সীমানা ছাড়িয়ে গেছে।অনেক বেশি অস্পষ্ট হয়ে আসে শরীরটা।কেবল দীর্ঘ একটি অস্পষ্ট ছায়া দেখতে পায় সে।

আয়শা পড়েছে চিন্তায়।না বলে ওঁর স্বামী কখনো কোথাও যায়না।আর এতো রাতে শিখার বাবা যাবে কোথায়, সেটাই ভেবে পাচ্ছেনা আয়শা।

অনেক রাত হয়ে যাবার পরও যখন রমজান বাড়ি ফিরে আসেনা,আয়শা মাথায় হাত রেখে দাওয়ায় বসে পড়ে।সকালেও যখন ফিরে আসেনা রমজান,এবার নিজেই সে রমজানকে খুঁজতে বেরিয়ে যায়।এ বাড়ি,ও বাড়ি সব জায়গায় খোঁজে।কিন্তু রমজানের খোঁজ পায়না। কেউ দেখেওনি রমজানকে কোথাও যেতে।আয়শা নিজের কপাল থাপড়াতে থাকে।কেন সে রাতে রমজানকে যেতে দিলো!আয়শার মন বুঝতেই পারেনা,যে মানুষ যেতে চায়,তাকে ধরে রাখা দায়!সারাদিন ধরে সে রমজানকে খোঁজে।

সূর্য প্রায় ডুবো ডুবো। আসগর আলী তাঁর ধার দেয়া টাকা নিতে আসে রমজানের বাড়িতে।গতকাল বাজারে রমজান বলেছে,সকালেই টাকাটা দিয়ে দিবে।কিন্তু রমজান আর আসেনি।এদিকে টাকার মায়াও অনেক, হোক তার পরিমাণ কম।তাই শত ঝামেলা রেখেই আসগর টাকা নিতে এসেছে সন্ধ্যার সময়।১০ হাজার টাকাই বা কম কিসে?সুদে আসলে আরেকটু বেশি পেত।কিন্তু রমজান গরিব বলে সুদ একটু কম নিচ্ছে।আসগর সুদখোর হলেও মানুষ ভালো।যদিও টাকার হিসাবটা তাঁর কাছে স্পষ্ট।

তাইতো নিজেই টাকা নিতে চলে এসেছে।পরে যদি নানান অজুহাতে টাকাটা আর না দেয় রমজান !এমনিতেই নতুন নতুন সমস্যা তৈরি হতে গরিবদের সময় লাগেনা।

আসগর রমজানকে ডাকতে থাকে।অনেক ডাকাডাকির পরও ঘর থেকে কেউ সাঁড়া দেয়না।ঘরটাও অন্ধকার।

আসগর কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকে।পাশের বাড়ির কদম আলী ডাক শুনে এগিয়ে আসে।

“কদম আলী,রমজানের বাড়ির কি কেউ বাড়িত নাই?ডাকতাছি,কেউ শব্দ করেনা ক্যান?”

“রমজান তো কাইল রাইত ঘরে ফেরে নাই।ওর বউ দেখলাম সারাদিন রমজানের খোঁজ করছে।এহনও বোধহয় খুঁজতাছে।বুঝলাম না,এতো খোঁজনের কি আছে!পুরুষ মানুষ এক রাইত ঘরে না ফিরলে কি অয়?” কথা শেষ করে কদম আলী চলে যায়।আসগরের মনে দুশ্চিন্তার ছাপ।ও ভাবে,”রমজান আবার টাকা দেওয়েনের নাম কইরা পলাইলো নাতো!

শিখা আর রাতুলকে আসতে দেখে আসগর বলে,”তগোর বাপ কই?”

-“আব্বায় কই জানি।মায় দেখতাছে।আমাগো বাড়িত পাঠাই দিছে।”আসগর আর দাঁড়ায়না।এমনিতেই তাঁর দেরি হয়ে গেছে।বাজারেও যাওয়া লাগবে আরেকবার।তাই দ্রুত যাওয়ার জন্য সে মাঠের মধ্য দিয়েই হাঁটতে থাকে।হঠাৎ কোনোকিছুতে সে হোঁচট খায়।হাতে ধরে রাখা লাইটটা ধরতেই দেখে একটা নিথর শরীর পড়ে আছে।চিনতে ভুল হয়না আসগরের।চোখগুলো মরে গিয়েও কেমন জীবন্ত চোখে চেয়ে আছে তাঁর দিকে।মুখে প্রচুর ফেনা লেগে।আসগর মনের অজান্তেই বলে ফেলে “ইন্না লিল্লাহ …”এবং ভয় পেয়ে চিৎকার দিয়ে উঠে।

আসগরের চিৎকার শুনে আশেপাশের মানুষ দৌড়ে আসে মাঠে।সবার মুখ দিয়ে দীর্ঘশ্বাস বের হয়।দীর্ঘশ্বাস দীর্ঘ থেকে আরো দীর্ঘ হয় কারো কারো।আয়শা শোরগোলের শব্দ পেয়ে এগিয়ে যায় মাঠের দিকে।ভিড় ঠেলে ভেতরে যায় সে।অন্ধকারে ভালোভাবে রমজানের লাশটা সে দেখতে পায়না।কিন্তু জোছনার আলোতে যতোটুকু দেখতে পেয়েছে,তাতেই

সে বুঝে গেছে লাশটা কার।

“আল্লাগো…”বলে একটা চিৎকার দেয় শুধু।তারপর পড়ে যায় আয়শা।সবাই ধরাধরি করে আয়শাকে বাড়ি নিয়ে আসে।কিন্তু লাশ আর ধরেনা কেউ।

জীবন্ত মানুষের মূল্য না থাকলেও সে শরীরের কিছুটা কদর থাকে সমাজে;মরা মানুষ সে যতো ধনীই হোকনা কেন ,মরে গেলে সে মানুষের কোনো মূল্যই নেই।রমজানের মতো মানুষদের আরো নেই।লাশটাকে ঘিরে একটা জটলা বেঁধেছে।কেউ কেউ টিউবলাইট উঁচু করে ধরে আছে।লাশের পাশেই পড়ে আছে বিষের বোতল।তবু্ও নানান কথা বলতে থাকে লোকে। সে সাথে চলছে পুলিশের আসার অপেক্ষা।রমজান নিজেই পুলিশকে খবর দিয়েছে।একসময় পুলিশ চলেও আসে।আয়শার জ্ঞান ফিরলেও কিছু বলেনা,কাঁদেনা।কেমন নিথর চোখে চেয়ে থাকে।দৃষ্টি অনেকদূর। সেটা ভেদ করার ক্ষমতা যেমন কারো নেই;তেমনি সেই দৃষ্টিতে যে দীর্ঘ একটা ছায়া নেমে এসেছে,সেই ছায়াটা সরানোর ক্ষমতাও কারো নেই।পুলিশ ময়নাতদন্ত করার জন্য রমজানের লাশটা নিয়ে যায়।

লোকজন এবং পুলিশ আসার পূর্বেই আসগর রমজানের পাঞ্জাবীর পকেটে বের হয়ে থাকা টাকাগুলো অনেক আগেই পকেটে ঢুকিয়ে নিয়েছিল।আর মনে মনে বলেছে ,”ব্যাটা মরে গিয়েও কথা রেখেছে!”

 





© Agooan News 2017
Design & Developed BY ThemesBazar.Com